দেশ যখন নতুন ‘সংস্কারের’ গল্প শুনছে, তখন দিনাজপুরের হিলির এক আবর্জনার স্তূপ থেকে উঠে এলো এক নির্মম ও কঠিন বাস্তবতা। আবর্জনার ভিড়ে অনাহারে শীর্ণ এক অজ্ঞাত ব্যক্তির মৃতদেহ পড়ে থাকার দৃশ্যটি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, সংস্কারের প্রতিশ্রুতির নিচে চাপা পড়ে যাচ্ছে প্রান্তিক মানুষের বেঁচে থাকার আর্তনাদ। এই একটি ছবিই যেন হয়ে উঠেছে দেশের বর্তমান পরিস্থিতির এক জীবন্ত পোস্টমর্টেম রিপোর্ট।
ছবিটিতে দেখা যায়, মৃত ব্যক্তিটি আবর্জনা ও উচ্ছিষ্টের মধ্যেই শুয়ে আছেন। তার শীর্ণ, অনাহারক্লিষ্ট শরীর এবং পেটের দিকে তাকালে গভীর অপুষ্টির ছাপ স্পষ্ট। জীবনের শেষ মুহূর্তে তার আশ্রয়স্থল হয়েছে পরিত্যক্ত প্লাস্টিক, খাবারের প্যাকেট আর নোংরার স্তূপ, যা এক চরম অসহায়ত্বের প্রতিচ্ছবি। এই দৃশ্য শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটের এক জীবন্ত দলিল হয়ে উঠেছে।
ঘটনাটি দেখে ক্ষোভে ফেটে পড়েন স্থানীয়রা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, “এই দৃশ্য ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। মানুষ যে ময়লার সাথে মিশে মরে পড়ে থাকতে পারে, তা কখনো ভাবিনি। আমাদের চোখের সামনে একজন মানুষ না খেতে পেয়ে মরে গেল, আর আমরা কিছুই করতে পারলাম না। এই লজ্জা আমরা রাখব কোথায়?”
বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটলো যখন দেশে অতি দারিদ্র্যের হার নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ৫ই আগস্টের পূর্বে দেশে অতি দারিদ্র্যের হার ছিল ৬ শতাংশের কিছু বেশি, যা সম্প্রতি বেড়ে ৯.৩৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে বলে জানা যায়। দেশের মোট জনসংখ্যা ১৮ কোটি ধরলে, বর্তমানে প্রায় ১ কোটি ৬৩ লক্ষ মানুষ অতি দারিদ্র্যের শিকার। যে সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে কমার কথা ছিল, তা এখন লাগামহীনভাবে বাড়ছে, যার করুণ পরিণতিই যেন হিলির এই দৃশ্য।
এই করুণ মৃত্যুর প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ভূমিকা নিয়ে কঠোর সমালোচনা উঠেছে। অর্থনীতিবিদ ড. খালেদ হাসান মন্তব্য করেন, “এটি বিচ্ছিন্ন কোনো দুর্ঘটনা নয়, এটি আমাদের অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার একটি অবশ্যম্ভাবী পরিণতি। যখন দেশে বিনিয়োগের পরিবেশ থাকে না, যখন প্রতিহিংসার রাজনীতিতে ব্যবসা-বাণিজ্য ধ্বংস হয়, তখন কর্মসংস্থান সংকুচিত হয়। এর প্রথম শিকার হয় সমাজের সবচেয়ে প্রান্তিক মানুষগুলো। সরকার ‘সংস্কার’-এর কথা বলছে, কিন্তু অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারলে সেই সংস্কার অর্থহীন। এই মৃতদেহটি আমাদের নীতি নির্ধারকদের জন্য একটি অশনি সংকেত।”
সমালোচকদের মতে, প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার দেশের আইনশৃঙ্খলা ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। দেশজুড়ে দুর্নীতি, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ এবং প্রতিহিংসার রাজনীতির কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা নেমে এসেছে। বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলার মতো ঘটনায় বিনিয়োগকারীরা আস্থা হারাচ্ছেন এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সংকুচিত হয়ে পড়েছে। তাদের মতে, এই অব্যবস্থাপনার ফলেই দেশে এক ধরনের দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যার সবচেয়ে নির্মম শিকার হচ্ছেন প্রান্তিক ও অসহায় মানুষেরা।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী লিখেছেন, “ফেসবুকে ছবিটা দেখে কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে ছিলাম। আমরা একটা পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেছিলাম, একটা সুন্দর ভবিষ্যতের আশা করেছিলাম। কিন্তু পরিবর্তনের নামে যদি অনাহার আর লাশের রাজনীতি দেখতে হয়, তাহলে এই পরিবর্তন আমরা চাইনি। এই লাশের দায়ভার পুরো সিস্টেমের, আমাদের সবার।”
মৃত ব্যক্তির পেটের দিকে নির্দেশ করে একজন সামাজিক বিশ্লেষক মন্তব্য করেন, “এই শীর্ণ পেটটিই বর্তমান বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি। একদিকে যখন সংস্কারের কথা বলা হচ্ছে, তখন অন্যদিকে অনাহারে-অর্ধাহারে মানুষের মৃত্যু ঘটছে আবর্জনার স্তূপে।”
হিলিতে পাওয়া এই নাম-পরিচয়হীন মরদেহটি শুধু একজন ব্যক্তির নয়, বরং এটি একটি ভেঙে পড়া ব্যবস্থার প্রতিচ্ছবি। যখন একজন মানুষকে আবর্জনার স্তূপে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে হয়, তখন তা সমগ্র সমাজ ও রাষ্ট্রের ব্যর্থতাকেই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। এই ছবিটি একবিংশ শতাব্দীর বাংলাদেশে এক কঠিন প্রশ্ন রেখে গেল: সংস্কার ও অগ্রগতির এই যাত্রায় অসহায় মানুষগুলোর স্থান কোথায়?
আপনার মন্তব্য প্রদান করুন...