দীর্ঘ ৪৫ বছর ধরে পরিচয় গোপন রেখে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ফাঁকি দিয়ে আসছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যা মামলার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি মেজর (অব.) মো. মোজাফফর হোসেন। নাম-পরিচয় পরিবর্তন, চেহারার পরিবর্তন, পুরোনো যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা—সবকিছু করেও শেষ পর্যন্ত রক্ষা হয়নি। নাকের নিচে থাকা একটি তিল বা আঁচিলই হয়ে ওঠে তার পরিচয় শনাক্তের গুরুত্বপূর্ণ সূত্র। সেই সূত্র ধরে রাজধানীর বনানী ডিওএইচএস এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ।
গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, মোজাফফর হোসেন দীর্ঘ সময় ভিন্ন পরিচয়ে আত্মগোপনে ছিলেন। জীবনের শেষভাগে তিনি গোপনে দেশে ফিরে বনানী ডিওএইচএসের মতো অভিজাত ও নিরাপত্তাবেষ্টিত এলাকায় বসবাস শুরু করেন। নিজেকে একজন সাধারণ অবসরপ্রাপ্ত বৃদ্ধ হিসেবে পরিচয় দিলেও প্রতিবেশীরা জানতেন না, তাদের পাশেই বসবাস করছেন দেশের অন্যতম আলোচিত রাষ্ট্রপতি হত্যা মামলার পলাতক দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি।
ডিবির দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, কয়েক মাস ধরে গোয়েন্দারা তার মেয়ের কর্মস্থলকে কেন্দ্র করে অনুসন্ধান চালান। তথ্য অনুযায়ী, তার মেয়ে একটি বেসরকারি টেলিকম প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। সেই সূত্র ধরে সম্ভাব্য বাসা শনাক্ত করা হয় এবং দীর্ঘদিন নজরদারি চালানো হয়।
গোয়েন্দাদের কাছে আগে থেকেই মোজাফফরের শারীরিক বৈশিষ্ট্য সংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ছিল—তার নাকের নিচে একটি কালো তিল বা আঁচিল রয়েছে। চেহারা ও পরিচয় পরিবর্তন করলেও জন্মগত এই চিহ্ন পরিবর্তন করা সম্ভব হয়নি। ফলে অভিযানের সময় এটিকেই প্রধান শনাক্তকরণ সূত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
বুধবার গভীর রাতে ডিবির একটি বিশেষ দল ছদ্মবেশে তার বাসায় যায়। তারা নিজেদের টেলিকম প্রতিষ্ঠানের কর্মী পরিচয় দিয়ে দরজায় কড়া নাড়ে এবং তার মেয়ের খোঁজ করেন। এ সময় এক বয়স্ক ব্যক্তি দরজা খুলে এসে জানতে চান এত রাতে কী প্রয়োজন। গোয়েন্দারা কৌশলে তার চেহারা পর্যবেক্ষণ করে নাকের নিচে থাকা সেই পরিচিত আঁচিল দেখতে পান।
একপর্যায়ে তারা জানতে চান তিনি কে। জবাবে ওই ব্যক্তি বলেন, “আমি মোজাফফর, মেয়ের বাবা।” এই স্বীকারোক্তির পরই গোয়েন্দারা নিশ্চিত হন এবং সঙ্গে সঙ্গে তাকে গ্রেফতার করেন। দীর্ঘদিনের পলাতক আসামি মুহূর্তেই আইনের আওতায় চলে আসেন।
রাষ্ট্রপতি হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশগ্রহণের অভিযোগ
মামলার নথি ও তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে, ১৯৮১ সালের ৩০ মে গভীর রাতে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে সংঘটিত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডে মেজর মোজাফফর হোসেন সরাসরি অংশ নেন। তিনি কিলিং স্কোয়াডের সক্রিয় সদস্য ছিলেন এবং রাষ্ট্রপতিকে শনাক্ত করার পাশাপাশি গুলি চালানোর অভিযোগও তার বিরুদ্ধে রয়েছে।
হত্যাকাণ্ডের পর তিনি তৎকালীন ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুরকে ফোন করে ইংরেজিতে জানান, “The President has been killed.”
সামরিক অভ্যুত্থান ব্যর্থ হওয়ার পর বিদ্রোহের সঙ্গে জড়িত অনেক কর্মকর্তা গ্রেফতার হলেও মোজাফফর হোসেন এবং মেজর এস. এম. খালেদ পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। পরে তারা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে আশ্রয় নেন।
ভারতে আত্মগোপন ও ভুয়া পরিচয়ের জীবন
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘ সময় ভারতে ছদ্মনামে অবস্থান করেন মোজাফফর। তিনি ভুয়া পরিচয়পত্র, জাল নথি এবং বিকল্প পরিচয় ব্যবহার করে নিজেকে আড়ালে রাখেন। এমনকি এসব নথির মাধ্যমে বিভিন্ন দেশে ভ্রমণও করেছেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
পরিচয় গোপন রাখতে তিনি পরিবার ও পুরোনো পরিচিতদের সঙ্গে যোগাযোগ সীমিত করে দেন। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে তার অবস্থান সম্পর্কে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য পায়নি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
ডিএমপি ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, মেজর (অব.) মোজাফফর হোসেন একজন সাবেক সামরিক কর্মকর্তা এবং কোর্ট মার্শালের মাধ্যমে দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি। তাই প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে তাকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, ১৯৮১ সালের ৩০ মে রাতে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে সংঘটিত হামলায় তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হন। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে কয়েকজন সামরিক কর্মকর্তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন মেজর (অব.) মোজাফফর হোসেন, যিনি ঘটনার পর থেকেই পলাতক ছিলেন এবং অবশেষে ৪৫ বছর পর গ্রেফতার হলেন।
আপনার মন্তব্য প্রদান করুন...